Prince Review: উত্থানের গল্প, স্টাইলের জৌলুস, আর অসম্পূর্ণ সম্ভাবনার এক মিশ্র বাস্তবতা

Prince: Once Upon a Time in Dhaka : Movie Review
Prince: Once Upon a Time in Dhaka : Movie Review


‘প্রিন্স’: উত্থানের গল্প, স্টাইলের জৌলুস, আর অসম্পূর্ণ সম্ভাবনার এক মিশ্র বাস্তবতা

শিমুল চৌধুরী ধ্রুব:

ভূমিকা, প্রেক্ষাপট, গল্প ও কাঠামো বিশ্লেষণ

বাংলা চলচ্চিত্রে গত কয়েক বছরে বড় বাজেটের ম্যাস-অ্যাকশন সিনেমার সংখ্যা বেড়েছে। দর্শকদের রুচির পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক মানের সিনেমার সঙ্গে পরিচয়, এবং স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রির প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব—সব মিলিয়ে নির্মাতারা এখন আগের তুলনায় বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প হাতে নিচ্ছেন। সেই ধারাবাহিকতায় নির্মিত হয়েছে Prince: Once Upon a Time in Dhaka—একটি স্টাইলাইজড গ্যাংস্টার ড্রামা, যা নব্বই দশকের ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

পরিচালক Abu Hayat Mahmud এই সিনেমার মাধ্যমে একটি বড় স্কেলের অপরাধ-গাথা তুলে ধরতে চেয়েছেন। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ঢাকাই সিনেমার মেগাস্টার Shakib Khan, যিনি ‘প্রিন্স’ চরিত্রের মাধ্যমে আবারও নিজের ম্যাস-হিরো ইমেজকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন।

‘প্রিন্স’ সিনেমাকে শুধুমাত্র একটি অ্যাকশন ফিল্ম হিসেবে দেখলে ভুল হবে না। বরং এটি এক ধরনের চরিত্রভিত্তিক উত্থানের গল্প—একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে অপরাধ জগতের কেন্দ্রে পৌঁছে যায়, ক্ষমতা অর্জন করে, এবং সেই ক্ষমতার মূল্য চুকাতে শুরু করে—এই যাত্রাটিই সিনেমার মূল ভিত্তি। তবে এই যাত্রা কতটা স্মরণীয় হয়েছে, আর কতটা কেবল স্টাইলের জৌলুসে সীমাবদ্ধ থেকেছে—সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় সিনেমাটির বিশ্লেষণ।

প্রেক্ষাপট: নব্বই দশকের ঢাকা—বাস্তবতা নাকি স্টাইলাইজড কল্পনা?

‘প্রিন্স’ সিনেমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর সময়কাল নির্বাচন। নব্বই দশকের ঢাকা—যে সময়টিকে অনেকেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিস্তারের সময় হিসেবে চিহ্নিত করেন—সেই সময়কে সিনেমার পটভূমি হিসেবে নেওয়া হয়েছে।

এই সময়কাল নির্বাচন নির্মাতাদের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। কারণ নব্বই দশকের পরিবেশকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হলে সেট ডিজাইন, কস্টিউম, যানবাহন, ভাষা—সবকিছুতেই নির্ভুলতা দরকার।

এই চেষ্টা কিছু ক্ষেত্রে সফল হলেও, কিছু দৃশ্যে সময়কালগত অসামঞ্জস্য চোখে পড়ে—যেমন প্রযুক্তিগত উপকরণ বা পরিবেশের কিছু উপাদান নব্বই দশকের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়নি।

গল্প: ধীর উত্থান, দ্রুত বিস্তার

সিনেমার গল্প মূলত ‘প্রিন্স’ নামের এক চরিত্রকে কেন্দ্র করে, যিনি ধীরে ধীরে অপরাধ জগতের শক্তিশালী এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তার বিরুদ্ধে রয়েছে খুন, চাঁদাবাজি, অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা অভিযোগ, এবং পুলিশ তাকে খুঁজে বেড়ায়।

গল্পটি নন-লিনিয়ার কাঠামোতে নির্মিত, যেখানে অতীত ও বর্তমানের দৃশ্য একত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। সিনেমাটি দুইটি অধ্যায়ে বিভক্ত—প্রথম অংশে প্রিন্সের উত্থান এবং দ্বিতীয় অংশে তার সাম্রাজ্যের বিস্তার।

প্রথমার্ধ: চরিত্র নির্মাণের সময়সাপেক্ষ যাত্রা

সিনেমার প্রথমার্ধ মূলত প্রিন্সের উত্থানের গল্প নিয়ে। এখানে পরিচালক সময় নিয়ে চরিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। প্রিন্স কীভাবে অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়, কীভাবে ধীরে ধীরে তার প্রভাব বাড়ে—এই বিষয়গুলো ধীরে ধীরে তুলে ধরা হয়েছে।

এই ধীরগতির গল্প বলার একটি ইতিবাচক দিক আছে—এটি চরিত্রকে গভীরভাবে বোঝার সুযোগ দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে এর একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে—গল্পের গতি অনেক সময় অতিরিক্ত ধীর মনে হয়।

বিরতির আগে উত্তেজনার মুহূর্ত

বিরতির আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য রয়েছে, যা সিনেমার অন্যতম ‘হাই মোমেন্ট’ হিসেবে কাজ করে। এই দৃশ্যটি দর্শকের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করে—বিরতির পর গল্প আরও তীব্র হবে।

কিন্তু বিরতির পর সেই উত্তেজনার ধারাবাহিকতা সবসময় বজায় থাকে না—এটাই সিনেমার অন্যতম বড় দুর্বলতা।

দ্বিতীয়ার্ধ: ক্ষমতার বিস্তার ও চিত্রনাট্যের বিচ্ছিন্নতা

দ্বিতীয়ার্ধে গল্পের ফোকাস চলে যায় প্রিন্সের ক্ষমতা বিস্তার এবং তার সাম্রাজ্য পরিচালনার দিকে। এখানে চরিত্রটি একটি পূর্ণাঙ্গ অপরাধ-নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই অংশে গল্পের গতি তুলনামূলক দ্রুত হলেও চিত্রনাট্যের সংযোগ সবসময় মসৃণ নয়। কিছু দৃশ্যের মধ্যে লজিক্যাল সংযোগ দুর্বল মনে হয়েছে। ফলে দর্শকের মনোযোগ কিছু সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

তবে এই অংশেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের উপস্থিতি গল্পকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। বিশেষ করে কিছু পার্শ্ব চরিত্র—যেমন গোপাল বা আফগানি পাঠান—গল্পের ভেতরে উত্তেজনা তৈরি করতে সাহায্য করেছে। তাদের সংলাপ, উপস্থিতি এবং ব্যক্তিত্ব গল্পের ভেতরে উত্তেজনা তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

ক্লাইম্যাক্স: শক্তিশালী উপস্থিতি, দর্শকের প্রতিক্রিয়া

সিনেমার শেষ অংশটি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। বিশেষ করে শেষ কয়েক মিনিটে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তা দর্শকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এই অংশে অ্যাকশন, আবেগ এবং চরিত্রের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে একটি ম্যাস-অ্যাকশন সিনেমার প্রত্যাশিত ‘পাওয়ারফুল’ সমাপ্তি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে কিছু দর্শকের কাছে এই সমাপ্তি একটি সম্ভাব্য সিক্যুয়েলের ইঙ্গিত হিসেবেও মনে হতে পারে। অর্থাৎ গল্প পুরোপুরি শেষ না হয়ে ভবিষ্যতের জন্য কিছু জায়গা খোলা রাখা হয়েছে।

কাঠামো ও মৌলিকতা: পরিচিত ছক, নতুন উপস্থাপনা?

গ্যাংস্টার ঘরানার সিনেমায় একটি নির্দিষ্ট ছক প্রায়ই দেখা যায়—একজন সাধারণ মানুষের উত্থান, ক্ষমতার বিস্তার, এবং শেষ পর্যন্ত সংঘাত। ‘প্রিন্স’ সেই পরিচিত ছক অনুসরণ করেছে।

এখানে মৌলিকতার প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিছু দর্শকের কাছে গল্পের কিছু অংশ পরিচিত মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে একই সঙ্গে এই পরিচিত কাঠামোর মধ্যেও পরিচালক স্টাইল এবং ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছেন।

সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন

গল্পের ভিত্তি শক্ত হলেও এর গতি, সংযোগ এবং মৌলিকতার জায়গায় কিছু ঘাটতি রয়েছে। তবে একই সঙ্গে একটি বড় স্কেলের আখ্যান নির্মাণের প্রচেষ্টা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে—যা বাংলা সিনেমার বর্তমান ধারার জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।


অভিনয়, পরিচালনা ও টেকনিক্যাল বিশ্লেষণ

অভিনয়: একজন মেগাস্টারের কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকা সিনেমা

শাকিব খান এই সিনেমার প্রাণ। তার উপস্থিতি ছাড়া ‘প্রিন্স’ কল্পনা করাও কঠিন। তার চোখের অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং দৃশ্যের নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতেই একটি আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে তার স্ক্রিন কমান্ড অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে আবেগঘন কিছু দৃশ্যে সবসময় সেই গভীরতা পাওয়া যায়নি।

নায়িকাদের উপস্থিতি

তাসনিয়া ফারিণ ও জ্যোতির্ময়ী কুন্ডুর উপস্থিতি গল্পে রয়েছে, কিন্তু গভীরতা সবসময় পাওয়া যায়নি। তাদের সংলাপ এবং আবেগপূর্ণ দৃশ্যগুলোতে কিছু ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে।

সহ-অভিনেতাদের ভূমিকা

গোপাল, আফগানি পাঠান এবং পার্শ্ব চরিত্রগুলো গল্পের নাটকীয়তা বাড়িয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেছে।

পরিচালনা

পরিচালক উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও কিছু অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। গল্পের গতি ও সংযোগ সবসময় মসৃণ নয়। তবে ভিজ্যুয়াল স্টাইল এবং অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে তার দক্ষতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।

টেকনিক্যাল দিক

  • সিনেমাটোগ্রাফি ও ভিজ্যুয়াল: কিছু দৃশ্যে চোখে আটকে যায়, কিন্তু সব দৃশ্যে ধারাবাহিকতা নেই।
  • অ্যাকশন সিকোয়েন্স: শক্তিশালী, কিন্তু অতিরিক্ত স্লো-মোশন কিছু দৃশ্যের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
  • ভিএফএক্স ও গ্রিন স্ক্রিন: কিছু দৃশ্যে নিম্নমানের, যা বাস্তবতা নষ্ট করেছে।
  • সংগীত ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর: অ্যাকশন দৃশ্যকে শক্তিশালী করেছে, কিছু গান গল্পের সঙ্গে মানানসই নয়।

পজিটিভ ও নেগেটিভ বিশ্লেষণ

পজিটিভ দিক

  1. শাকিব খানের শক্তিশালী স্ক্রিন প্রেজেন্স
  2. কিছু পার্শ্ব চরিত্রের দৃঢ়তা ও সংলাপ
  3. ভিজ্যুয়াল স্টাইল ও কালার গ্রেডিং
  4. উত্তেজনাপূর্ণ অ্যাকশন দৃশ্য
  5. ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর দৃশ্যের আবেগ বাড়িয়েছে

নেগেটিভ দিক

  1. প্রথমার্ধের ধীরগতি
  2. চিত্রনাট্যের অসামঞ্জস্য
  3. ভিএফএক্স ও গ্রিন স্ক্রিনের সীমাবদ্ধতা
  4. নারী চরিত্রের অপূর্ণতা
  5. গল্পে মৌলিকতার ঘাটতি

শিল্পমান ও ইন্ডাস্ট্রির প্রেক্ষাপট

‘প্রিন্স’ বড় স্কেলের ম্যাস-অ্যাকশন সিনেমা হিসেবে সাহসী প্রচেষ্টা। এটি প্রমাণ করে বাংলা সিনেমা বড় স্কেলে ভাবতে শিখছে, তবে শক্তিশালী গল্প এবং নিখুঁত নির্মাণ ছাড়া বড় স্বপ্ন পূর্ণতা পায় না।

দর্শক প্রতিক্রিয়া

  • ম্যাস দর্শক: অ্যাকশন, স্টাইল এবং শাকিব খানের উপস্থিতি উপভোগ করেছেন।
  • সমালোচক: গল্পের গতি, মৌলিকতা ও টেকনিক্যাল সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

চূড়ান্ত উপসংহার

‘প্রিন্স’ নিখুঁত সিনেমা নয়, তবে এটিকে ব্যর্থও বলা যায় না। এটি আশা ও সীমাবদ্ধতার মিশ্রণ। শাকিব খানের শক্তিশালী উপস্থিতি, কিছু স্মরণীয় অ্যাকশন দৃশ্য এবং ভিজ্যুয়াল স্টাইল সিনেমাটিকে দেখার মতো অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।

চূড়ান্ত রেটিং: ৩.৫ / ৫

কারা দেখবেন?

  • ম্যাস-অ্যাকশন সিনেমা পছন্দকারীরা
  • শাকিব খানের নতুন লুক ও চরিত্র দেখতে ইচ্ছুক দর্শক
  • বড় স্কেলের ঢাকাই সিনেমার অভিজ্ঞতা নিতে চাওয়া দর্শক
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url