Kush : বাংলাদেশের নতুন আতঙ্ক সিনথেটিক মাদক ‘কুশ’ আসলে কি?
স্পেশাল রিপোর্টার: দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ২০২২ সালের অগাস্টের গোড়ার দিকে ঢাকা থেকে ওনাইসি সাঈদ নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে। এরপরই জানা যায় যে, তিনি নিজের বাড়িতেই একটি বিশেষ মাদক তৈরি করে বিক্রি করছিলেন, যা বাংলাদেশে একদম নতুন। এর আগে দেশে এই মাদক ব্যবহারের কোন খবর পাওয়া যায়নি।
নতুন এই মাদকটির নাম কুশ (Kush)। একই সাথে তিনি বিক্রি করছিলেন হেম্প, মলি, এডারল ও ফেন্টানিল সহ আরও কয়েকটি অপ্রচলিত ধরনের মাদক। বিদেশ থেকে পড়ালেখা করে আসা ওই ব্যক্তি নিজের বাড়িতে কুশ তৈরির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ স্থাপনা তৈরি করেছিলেন। তিনি গ্রিন হাউজ তৈরি করে গাজার চাষ করছিলেন। পাশাপাশি সেই গাজার সাথে রাসায়নিক মিশিয়ে কুশ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বসিয়েছিলেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, কুশের মতো অপ্রচলিত ধরনের কিছু মাদক বাংলাদেশে আসা শুরু হয়েছে, যদিও সে সময়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দেয় ক্রিস্টাল মেথ বা আইস।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত তাদের হাতেই ধরা পড়ে প্রায় ৫৮ কেজি আইস, যার প্রতি কেজিই অপরাধ জগতে এক কোটি টাকার বেশি দামে বেচাকেনার কথা শোনা যায়। এর মধ্যে শুধু জানুয়ারিতেই ধরা পড়েছিল ২২ কেজির বেশি আইস। যদিও ২০১৯ সালে যখন প্রথম আইস উদ্ধার হয়েছিলো ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে তখন সেটি ততটা পরিচিত মাদক ছিল না। এরপর আইসের বিস্তার অনেক বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি যোগ হয় নতুন নতুন মাদক। এরই একটি হলো কুশ।
‘কুশ’ আসলে কি?
সিনথেটিক মাদক ‘কুশ’ হলো মূলত ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম ক্যানাবিনয়েড বা অতি-আসক্তিকর রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণে প্রস্তুত অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি মাদক, যা দেখতে সাধারণ মারিজুয়ানা বা গাঁজার মতো। প্রাকৃতিক ক্যানাবিস বা গাঁজার ফুল/কুঁড়ির সাথে অতিরিক্ত ‘টেট্রাহাইড্রো ক্যানাবিনল’ (THC) বা ফেন্টানিল, ট্রামাডল এবং নাইটাশিনের (Nitazenes) মতো মারাত্মক সিনথেটিক ওপিয়য়েড কেমিক্যাল স্প্রে করে এটি তৈরি করা হয়। এটি প্রচলিত গাঁজার চেয়ে অন্তত ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী ও ক্ষতিকর। এই মাদক স্নায়ু উদ্দীপক বা স্নায়ু বিধ্বংসী। সাধারণ আফিমের চেয়ে ৫০ গুন বেশি আসক্তি তৈরি করে এই মাদক। এটি ব্যবহারে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘন্টা পাার্টি মুডে থাকতে পারে আসক্তিকারী। এটি ইয়াবার মতো কিছুটা আসক্তি তৈরি করে।
কুশ মাদকটির মূল উপাদানসমূহ
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি ও স্থানীয় ল্যাবগুলোতে অঞ্চলভেদে কুশ তৈরিতে নানা রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়-
* সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েড ও THC: গাঁজার মতো অনুভূতি তৈরির জন্য কৃত্রিম কেমিক্যাল।
* সিনথেটিক ওপিয়য়েড (ফেন্টানিল ও নাইটাশিন): মরফিনের চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী চেতনা-নিয়ন্ত্রণকারী কেমিক্যাল। গবেষণায় দেখা গেছে, কুশ নমুনার প্রায় ৫০% অংশে অতি-আসক্তিকর নাইটাশিন থাকে।
* অন্যান্য তরল রাসায়নিক: ফরমালডিহাইড, অ্যাসিটোন বা ট্রামাডলের মতো কড়া রাসায়নিক কেমিক্যাল এতে মিশ্রিত থাকে।
কিসের ওপর ভিত্তি করে এটি কাজ করে?
প্রাকৃতিক গাঁজা বা ক্যানাবিসের একটি শক্তিশালী প্রজাতিকে 'কুশ' বলা হলেও বর্তমানের অবৈধ বাজারে এটি পুরোপুরি রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত রূপে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ উদ্ভিদের পাতার ওপর তীব্র নেশাদায়ক কেমিক্যাল স্প্রে করার পর সেই শুকানো পাতা ধূমপান বা ইনহেলার হিসেবে সেবন করা হয়। এর মিষ্টি গন্ধের কারণে এটি সহজে চেনা কঠিন।
‘কুশ’ কতটা বেশি ভয়ংকর ও ক্ষতিকর
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেন, মাদক হিসেবে ‘কুশ’ বেশি ভয়ংকর ও ক্ষতিকর। এটি একটি সিনথেটিক মারিজুয়ানা, যা বাংলাদেশের প্রচলিত গাজা থেকে অন্তত একশগুণ বেশি শক্তিশালী। ঢাকায় যাকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে তিনি গাজার সাথে অতিরিক্ত টেট্রাহাইড্রো ক্যানাবিনল (রাসায়নিক) মিক্স করে ট্যাবলেট ও লিকুইড আকারে কুশ তৈরি করছিলেন।”
তিনি বলেন, ‘ইউরোপ আমেরিকায় এটি মাদকসেবীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হলেও সেখানে এর আছে ভিন্ন ভিন্ন নাম। আর উপমহাদেশে এর পরিচিতি হলো কুশ নামে। হিন্দুকুশ পর্বতমালা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান অঞ্চলের একটি দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল পর্বত এলাকাগুলোতে কুশ মাদকে ব্যবহৃত গাজার চাষ বেশি হয়। হিন্দুকুশ পর্বতমালা যেমন বৈরী, বিপদসঙ্কুল আর ভয়ংকর, এই মাদকটিও তেমনই ভয়ংকর। তাই এর নাম হিন্দুকুশের সঙ্গে মিলিয়ে ‘কুশ’ রাখা হয়েছে।
ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা আরো বলেন, “এ মাদকের প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি। এটি সেবন করলে কোন বোধশক্তি থাকে না এবং নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না। অন্য মাদকের চেয়ে দ্রুতগতিতেই লিভার ও কিডনি বিকল করে দিতে পারে কুশ নামের এই মাদকটি।
এই মাদকটি মূলত মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র বা সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। এতে তীব্র হ্যালুসিনেশন, সাইকোসিস (মানসিক বিভ্রম), ও আত্মনিয়ন্ত্রণহীন আচরণের মতো মানসিক বিকৃতি দেখা দেয়। এটি সেবনের পর মানুষ অবশ বা অচেতন হয়ে পড়ে, যার কারণে সেবনকারীকে দেখতে অনেকটা ‘জম্বি’ বা জীবন্ত লাশের মতো দেখায়। ‘কুশ’ দীর্ঘদিনের ব্যবহারে লিভার, কিডনি ফেইলিউর এবং ফুসফুসে মারাত্মক ইনফেকশন তৈরি হয়। যা মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়। সাধারণ আফিমের চেয়ে এটি ৫০ গুণ বেশি আসক্তি তৈরি করায় ওভারডোজের কারণে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যায়।
২০২২ সালের ২রা অগাস্ট রাতে ঢাকার গুলশান থেকে ওই ব্যক্তিকে আটকের পর দেশে প্রথমবারের মতো কুশ উদ্ধারের খবর দিয়েছিলো র্যাব। পরে সংস্থাটি সংবাদ সম্মেলনে জানায়, যাকে আটক করা হয়েছে তিনি নিজে মাদক সেবন করেন না। তবে তিনি নিজে মাদক তৈরি করে বা বিদেশ থেকে এনে নানা মাধ্যমে মাদকসেবীদের কাছে সরবরাহ করতেন। বিশেষ করে ঢাকার অভিজাত এলাকার পার্টিগুলোতে এগুলো সরবরাহ করা হতো এবং সেখানকার সূত্র থেকেই ওই ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য পেয়ে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব সেসময় জানিয়েছিলো, আটক হওয়া ব্যক্তি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে তাপ নিয়ন্ত্রিত গ্রো-টেন্ট (চাষের জন্য বিশেষ তাঁবু) এর মাধ্যমে অভিনব পন্থায় কুশ তৈরির প্লান্ট স্থাপন করেছিলেন।
আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সেসময় বলেছিলেন, ওনাইসীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোহাম্মদপুরের একটি ফ্ল্যাট বাসা থেকে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে তাপ নিয়ন্ত্রণ গ্রো-টেন্ট এর মাধ্যমে অভিনব পন্থায় বিদেশি প্রজাতির কুশ তৈরির প্লান্ট ও সেটআপ উদ্ধার করা হয়। এই মাদক রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোর ক্লাবে সরবরাহ করতেন সাঈদ। এই মাদক সেবন করে বড় লোকের ছেলে-মেয়েরা। তবে সাঈদের উদ্দেশ্য ছিল এসব মাদক নিয়ে গবেষণা করে ব্যতিক্রম একটি মাদক তৈরি করবে সে। তার আগেই আটক হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সাঈদ আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সময় এসব মাদক সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। এক পর্যায়ে দেশে এসে ২০১৪ সালে এই মাদক বিদেশ থেকে আমদানি করে বিভিন্ন ক্লাবে সরবরাহ করতো। আট মাস আগে সে পরিকল্পনা করে, সরাসরি কুশ আমদানি না করে এটি উৎপাদন করবে। এই জন্য আমেরিকা ও কানাডা থেকে কুশের বীজ এনে মোহাম্মদপুরের একটি ভাড়া বাসায় প্ল্যান্ট তৈরি করে। সেখানে ঘরের মধ্যে ফুলের টবে কুশের চারা রোপন করে। ওই চারা থেকে কুশ উৎপাদন করে প্রায় ৪০০ গ্রাম বিক্রিও করেছে সে। প্রতি ১০০ গ্রাম কুশ বিক্রি করেছে ৩ লাখ টাকায়। আর এই প্ল্যান্টে তার বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৩ লাখ টাকা।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের হিসেবে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ এবং সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী আছে ঢাকা বিভাগে। যদিও বেসরকারি হিসেবে, মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭০ লাখের কাছাকাছি বলে দাবি করে বিভিন্ন সংস্থা। এদের বিরাট অংশের মধ্যে জনপ্রিয় মাদক হলো ইয়াবা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আইস বেশি আসছে আর নতুন করে পাওয়া যাচ্ছে কুশের মতো অপ্রচলিত নানা মাদক, যা উদ্বেগ তৈরি করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মধ্যেও।
হাঙ্গামা/ধ্রুব
0 মন্তব্যসমূহ